Thu. Nov 5th, 2026

একটি দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি তার নাগরিকদের জন্য গৌরবের উপলক্ষ। কিন্তু সেই দেশেরই কোনো নাগরিক যদি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজের বাড়িতে নিরাপদ বোধ না করেন, তবে স্বাধীনতার অর্জন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ২০২১ সালের বাংলাদেশ এমন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

সুনামগঞ্জের শাল্লায় ভাঙচুর করা বাড়িঘর, কুমিল্লায় আক্রান্ত পূজামণ্ডপ, নোয়াখালীর চৌমুহনীতে নিহত ভক্ত, রংপুরের পীরগঞ্জে পুড়ে যাওয়া বসতভিটা—ঘটনাগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা হলেও আক্রান্ত মানুষের অভিজ্ঞতায় একটি মিল রয়েছে। তা হলো, রাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এবং বিপদের মুহূর্তে সেই নিরাপত্তা পাওয়ার বাস্তবতার মধ্যে গভীর ব্যবধান।

২০২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি তাই কেবল কতটি মন্দির ভাঙা হয়েছে বা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার ধর্মীয় উত্তেজনাকে সহিংসতায় রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে? কেন একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নিরপরাধ প্রতিবেশীর বাড়িতে হামলা চালানো যাচ্ছে? প্রশাসন কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে? আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেন সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের বদলে অনেক সময় পারস্পরিক অভিযোগেই বেশি মনোযোগী?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ নয়, মার্চের শাল্লা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, স্থানীয় সম্পদের দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাস একসঙ্গে দেখতে হবে।

শাল্লা: একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি গ্রাম এবং রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি

১৭ মার্চ ২০২১। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে কয়েক শ মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালায়।

এর আগের দিন গ্রামের যুবক ঝুমন দাস আপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলেন। স্থানীয় উত্তেজনার পর তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও গ্রামবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ৭৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—৩৫টি গুরুতরভাবে এবং আরও ৪০টি আংশিকভাবে। পরবর্তী মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা আরও বেশি বলে উঠে আসে। বহু বাসিন্দা লুটপাটের অভিযোগ করেন।

দ্য ডেইলি স্টারের ২৩ মার্চের মাঠপ্রতিবেদনে ঝর্ণা রানী দাসের অভিজ্ঞতা উঠে আসে। দুই মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো অর্থ ও স্বর্ণালংকার হারানোর কথা জানান তিনি। করোনা মহামারির মধ্যে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসা এই পরিবারের কাছে হামলাটি ছিল কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনা নয়; বহু বছরের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতা।

শাল্লার ঘটনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। ধর্মীয় ক্ষোভই কি একমাত্র কারণ?

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের প্রাথমিক অনুসন্ধানে স্থানীয় জলমহাল-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টিও উঠে আসে। প্রধান অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম স্বাধীন ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। তাঁর সঙ্গে গ্রামের কয়েকজনের জলমহাল নিয়ে বিরোধের অভিযোগ ছিল। অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে সেই বিরোধের ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তিও জানানো হয়।

অর্থাৎ ধর্মীয় উত্তেজনা এবং স্থানীয় সম্পদের স্বার্থের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন ছিল। তবে জলমহালের বিরোধই হামলার চূড়ান্ত কারণ, এমন সিদ্ধান্ত তখনকার তথ্য দিয়ে দেওয়া যায় না।

শহিদুলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। স্থানীয়ভাবে তাঁকে যুবলীগের নেতা বলা হলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়। এই বিরোধপূর্ণ তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে করিয়ে দেয়: কারও দলীয় পরিচয় নিশ্চিত না করেই রাজনৈতিক দায় নির্ধারণ যেমন অনুচিত, তেমনি সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি তদন্তের বাইরে রাখাও অগ্রহণযোগ্য।

এপ্রিল মাসে দায়িত্বে অবহেলার কারণে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়ে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—বিপদের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও একটি গ্রামকে রক্ষা করা গেল না কেন?

কুমিল্লা: গুজব যখন সংঘবদ্ধ সহিংসতার অস্ত্র

১৩ অক্টোবর ২০২১। দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দিঘির পাড়ের একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন পাওয়া যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রচারের পর ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে যায়। এরপর কুমিল্লার একাধিক মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর এবং সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, ইকবাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে মণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনায় শনাক্ত করা হয়েছে। ২১ অক্টোবর তাঁকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রাথমিক প্রচার ও সামাজিক উত্তেজনায় যে অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল, তদন্তের প্রাথমিক ফল সেই সরল ব্যাখ্যাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে সন্দেহভাজন ব্যক্তির গ্রেপ্তার, তাঁর উদ্দেশ্য এবং কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার অস্তিত্ব—এসব আলাদা অনুসন্ধানের বিষয়। ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে পুরো ঘটনার পরিকল্পনাকারী সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কুমিল্লায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ১৫ অক্টোবরের অনুসন্ধানে মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেন, একাধিকবার পুলিশ ও জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করেও তাঁরা সময়মতো সহায়তা পাননি।

চান্দমণি রক্ষাকালী মন্দিরে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বারবার হামলার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত ভাঙচুরের বর্ণনা পাওয়া যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।

দুই পক্ষের বক্তব্য আলাদা হলেও মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও আক্রমণ ঠেকানো না গেলে নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একটি গুজব সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু গুজব নিজে মন্দির ভাঙে না। মানুষকে সংগঠিত করা, আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিরোধ এড়িয়ে সহিংসতা চালানোর জন্য বাস্তব সংগঠন ও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। সেই সংগঠিত প্রক্রিয়া শনাক্ত করাই তদন্তের প্রধান দায়িত্ব।

চাঁদপুর: সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের নামে প্রাণহানি

কুমিল্লার ঘটনার উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জেও। ১৩ অক্টোবর রাতে মন্দির ও পূজামণ্ডপ ঘিরে হামলা এবং পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ঘটে।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে চারজনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়। পরবর্তী অনুসন্ধানে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।

হাজীগঞ্জের ঘটনা ধর্মীয় সহিংসতার আরেকটি কঠিন দিক সামনে আনে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আক্রান্ত নাগরিকদের রক্ষা করা, একই সঙ্গে জনতা নিয়ন্ত্রণের সময় অনাবশ্যক প্রাণহানি প্রতিরোধ করা।

পুলিশের ভাষ্য ছিল, সহিংস জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালানো হয়। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২১ অক্টোবরের বিবৃতিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

তদন্তের বিষয় তাই দুটি। প্রথমত, কারা ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে? দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বলপ্রয়োগ আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় সীমার মধ্যে ছিল কি না?

একটি অপরাধ ঠেকাতে গিয়ে আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটলে রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না।

নোয়াখালী: চৌমুহনীর মৃত্যু এবং নিরাপত্তার ভেঙে পড়া বিশ্বাস

১৫ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনীতে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ হামলা ঘটে। মন্দির, প্রতিমা, দোকানপাট ও ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়।

হামলায় নিহত হন যতন সাহা। পরদিন ইসকন মন্দিরের পাশের পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় প্রান্ত চন্দ্র দাসের মরদেহ।

প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। বিবিসির ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে তাঁর মা বনলতা দাসের শোক এবং ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের পূর্ববর্তী বিশ্বাসের কথা উঠে আসে। পরিবার ভেবেছিল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে থাকা ছেলে নিরাপদ। সেই বিশ্বাসই ভেঙে যায়।

একটি উপাসনালয় মানুষকে আত্মিক আশ্রয় দেয়। কিন্তু সেখানে হামলা হলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী শুধু স্থাপনার নিরাপত্তা হারায় না; নিজের পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে বেঁচে থাকার আস্থাও হারায়।

নোয়াখালীতে পুলিশের উপস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অনুসন্ধানী দল জানায়, প্রতিমা বিসর্জনের পর কিছু স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা চলে যান এবং হামলার সময় যথাযথ নিরাপত্তা পাওয়া যায়নি বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন।

২১ অক্টোবর প্রকাশিত অনুসন্ধানের বিবরণে সংস্থাটি প্রশাসনিক অবহেলাকে সহিংসতা বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

অক্টোবরের শেষ দিকে প্রান্ত দাসকে আঘাত করার বিষয়ে এক অভিযুক্ত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানায়। এটি তদন্তের একটি অগ্রগতি, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলা যায় না।

নোয়াখালীর অভিজ্ঞতা দেখায়, হামলা শেষ হওয়ার পর মামলা করা যতটা জরুরি, হামলা শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থল রক্ষা করা তার চেয়েও বেশি জরুরি।

রংপুরের পীরগঞ্জ: আগুনে পুড়ে যায় জীবিকার ভিত্তি

কুমিল্লা ও নোয়াখালীর আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই ১৭ অক্টোবর রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এক তরুণের কথিত ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরপর মাঝিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় বাড়িঘর, দোকান এবং অন্যান্য সম্পদে হামলা ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়।

পরদিনের সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের হিসাবে প্রায় ২০ থেকে ২৯টি ঘর বা স্থাপনা পুড়ে যাওয়ার তথ্য আসে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে ৬৬টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। গণনার পদ্ধতি ও ক্ষতির ধরন আলাদা হওয়ায় সংখ্যার পার্থক্য দেখা যায়।

১৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ ৪২ জনকে আটক করার তথ্য দেয়। পরে আরও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়।

পীরগঞ্জের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অভিযুক্ত ফেসবুক পোস্টদাতার বাড়িতে নিরাপত্তা দেওয়ার পরও আশপাশের অন্য পরিবারের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি সত্যিই আইন লঙ্ঘন করেছেন। তার বিচার করার ক্ষমতা আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। তাঁর প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা একই ধর্মের অন্য নাগরিকদের শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো জনতার নেই।

এই মৌলিক নীতিটি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে গুজবের মাধ্যমে যে কাউকে সহিংসতার লক্ষ্য বানানো সম্ভব।

পীরগঞ্জের বহু পরিবার হারিয়েছে বসতঘর, নগদ অর্থ, গবাদিপশু ও জীবিকার উপকরণ। সাহায্য ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুড়ে যাওয়া বাড়ি নির্মাণের খরচের বাইরেও ক্ষতির একটি অদৃশ্য অংশ আছে। সেটি হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

একজন দিনমজুর কয়েক দিনের কাজ হারালে তাঁর সংসার বিপদে পড়ে। সেখানে একটি পরিবার যদি একই রাতে ঘর, সঞ্চয় এবং উপার্জনের উপকরণ হারায়, তবে ক্ষতিপূরণের সীমিত অর্থ দিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া কঠিন।

পরিসংখ্যান: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংকেত

২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক মানবাধিকার পর্যালোচনা অনুযায়ী, বছরজুড়ে অন্তত ২০৪টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ বা মন্দির হামলার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ১৮৪টি বসতবাড়ি এবং ৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

এগুলো গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সংস্থাটির তথ্যসংগ্রহের ভিত্তিতে প্রস্তুত হিসাব। ফলে এগুলোকে দেশের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা কিংবা প্রতিটি ঘটনায় পৃথক অপরাধীর সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

এ ছাড়া অক্টোবর মাসে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অন্তত ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। অক্টোবরের বড় সহিংসতাগুলো তখনও ওই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

অক্টোবরের মৃত্যুর হিসাবেও বিভিন্ন পর্যায়ে পার্থক্য ছিল। ২৭ ডিসেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বছরশেষের প্রতিবেদনে ১৩ থেকে ২০ অক্টোবরের সহিংসতায় নয়জন নিহত এবং অন্তত দুই শতাধিক আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জন মুসলিম ও তিনজন হিন্দু বলে জানানো হয়। সহিংস জনতার আক্রমণ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানিকে আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।

এই তথ্যগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা ২০২১ সালের অক্টোবরে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। অক্টোবর বরং বহুদিনের দুর্বলতার একটি ভয়াবহ প্রকাশ।

রাজনীতি: অভিযোগের প্রতিযোগিতা, নাকি সত্য অনুসন্ধান?

অক্টোবরের হামলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোষীদের ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন। সরকার বিজিবি মোতায়েন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা, গ্রেপ্তার অভিযান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার উদ্যোগ নেয়।

এসব ব্যবস্থা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব কেবল হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নয়; সম্ভাব্য বিপদ প্রতিরোধ করাও।

অন্যদিকে সরকারের কয়েকজন নেতা বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয়, সরকারের ব্যর্থতা কিংবা পরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এসব ঘটনার পেছনে কাজ করেছে।

সমস্যা হলো, রাজনৈতিক অভিযোগ নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়।

কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, তাদের সহযোগী সংগঠন কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেই পরিচয়ের প্রাসঙ্গিকতা অবশ্যই তদন্তযোগ্য। কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের সাংগঠনিক নির্দেশে হামলা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

শাল্লায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং পীরগঞ্জে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য দেখায়, একেক ঘটনায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ভিন্ন হতে পারে। সব হামলাকে একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা তাই অনুসন্ধানের পরিপন্থী।

বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। শুধু সরকারের সমালোচনা নয়, আক্রান্ত এলাকায় দাঁড়ানো, দলীয় কর্মীদের সাম্প্রদায়িক প্রচার থেকে বিরত রাখা এবং সুনির্দিষ্ট তদন্তের দাবি তোলা রাজনৈতিক নৈতিকতার অংশ।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কোনো দলের স্থায়ী ভোটব্যাংক নন। তাঁদের নিরাপত্তা কোনো দলের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

জমি, জলমহাল এবং দুর্বল মানুষের অর্থনৈতিক ঝুঁকি

ধর্মীয় বিদ্বেষের পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ভূমি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগ।

ঐতিহাসিকভাবে শত্রু সম্পত্তি এবং পরবর্তীকালের অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা বহু হিন্দু পরিবারের সম্পত্তির অধিকারকে অনিশ্চিত করেছে। জাতিসংঘের ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের ২০১৬ সালের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ভূমির বিরোধকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

শাল্লার জলমহাল-বিরোধের অভিযোগ সেই বৃহত্তর সমস্যার প্রাসঙ্গিকতা মনে করিয়ে দেয়। তবে সব সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে জমি দখলের উদ্দেশ্য রয়েছে—এমন সাধারণীকরণও যথার্থ নয়।

অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও ধর্মীয় উত্তেজনা কখনো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আবার কোনো ঘটনায় মূল চালিকাশক্তি হতে পারে সরাসরি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। উদ্দেশ্য নির্ধারণে প্রতিটি ঘটনার পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।

একটি ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলে শুধু মালিক নন, কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষকের ঘর পুড়লে কৃষিজ উপকরণ নষ্ট হয়। মৎস্যজীবীর সঞ্চয় হারালে পরবর্তী মৌসুমের কাজ অনিশ্চিত হয়।

ফলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো ক্ষতির চিত্র পাওয়া যায় না। এটি সম্পত্তির অধিকার, জীবিকা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: প্রযুক্তি দায়ী, না বিদ্বেষের সংগঠকেরা?

শাল্লা, কুমিল্লা ও পীরগঞ্জের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি সাধারণ উপাদান।

কখনো একটি পোস্ট, কখনো ছবি, কখনো ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মানুষ যাচাই না করেই তা বিশ্বাস করেন। অন্যরা সেই আবেগকে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ বা সহিংসতায় রূপান্তর করেন।

কিন্তু প্রযুক্তিকে একমাত্র দায়ী করলে মানবিক ও রাজনৈতিক দায় আড়াল হয়ে যায়।

ফেসবুক কোনো ব্যক্তিকে প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন দিতে বাধ্য করে না। হামলার সিদ্ধান্ত মানুষের। গুজব প্রচারকারী, উত্তেজনাদাতা, সহিংসতায় অংশগ্রহণকারী এবং সম্ভাব্য সংগঠকদের দায় পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রকৃত সহিংসতার উসকানি এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি। কিন্তু অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা কিংবা কোনো ব্যক্তিকে জনতার রোষ থেকে বাঁচানোর বদলে শুধু তাঁকেই আটক করা যথেষ্ট সমাধান নয়।

যে সমাজে যুক্তির বদলে গুজব এবং আইনের বদলে জনতার প্রতিশোধ প্রাধান্য পায়, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু—কেউই দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ থাকেন না।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা: গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে কি সাফল্য মাপা যায়?

১৮ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের সহিংসতার ঘটনায় ৭১টি মামলা এবং ৪৫০ জনকে আটক করার কথা জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরও মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর আসে।

কিন্তু গ্রেপ্তার আর ন্যায়বিচার এক বিষয় নয়।

অভিযোগের তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যসংগ্রহ, অপরাধীর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারণ, যথাযথ অভিযোগপত্র এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন—সব ধাপ সম্পন্ন না হলে বিচার নিশ্চিত হয় না।

২৭ ডিসেম্বরের সমসাময়িক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পুনর্নির্মাণের সহায়তা পৌঁছানো নিয়েও অভিযোগ ছিল।

অন্যদিকে ২৮ অক্টোবর হাইকোর্ট কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও রংপুরের হামলার ঘটনায় বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। আদালত স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও নাগরিকদের রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ নিয়েও ব্যাখ্যা চান।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। তবে অনুসন্ধানের নির্দেশ নিজে প্রশাসনিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচারিক প্রমাণ নয়; তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া।

নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল্যায়ন হওয়া উচিত কত দ্রুত পুলিশ পৌঁছেছে, কতটি হামলা প্রতিরোধ করা গেছে, কতজন ক্ষতিগ্রস্ত নিরাপদে ফিরেছেন এবং কতটি মামলায় ন্যায়বিচারের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে—এসব মানদণ্ডে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: শুধু উৎসবের শুভেচ্ছা যথেষ্ট নয়

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের দীর্ঘ সামাজিক ঐতিহ্য রয়েছে। অনেক এলাকায় প্রতিবেশীরা একে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে সহযোগিতা করেন। সহিংসতার সময়ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদ করেছেন, আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

অক্টোবরের হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাজপথে নেমেছে। শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি ও অনশন হয়েছে। এসব উদ্যোগ সমাজের ভেতরে প্রতিরোধের শক্তি থাকার প্রমাণ।

কিন্তু সম্প্রীতির সামাজিক ঐতিহ্য স্বীকার করলেই কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয় না।

প্রকৃত সম্প্রীতি হলো এমন পরিবেশ, যেখানে কোনো নাগরিককে নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে চলতে হয় না; ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করতে ভয় পেতে হয় না; প্রতিবেশীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে ক্ষমতাবানের ব্যক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয় না।

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বাস্তবতাও এখানে আলোচনার বিষয়। এই সাংবিধানিক সহাবস্থান নিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনগত ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়—রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্ম পালনের অধিকার সমান মর্যাদার দাবিদার।

ডিসেম্বর ২০২১: এখন কী করা প্রয়োজন?

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অক্টোবরেই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ডিসেম্বরের শেষে এসে সেই দাবির তাৎপর্য কমেনি।

প্রথমত, প্রতিটি বড় হামলার স্বাধীন অনুসন্ধান প্রয়োজন। শুধু আক্রমণকারীদের নয়, পূর্বসতর্কতা পাওয়ার পর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, দায়িত্বে অবহেলা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ পুনর্বাসনব্যবস্থা। ঘর মেরামতের পাশাপাশি জীবিকা পুনরুদ্ধার, চিকিৎসা, শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা জরুরি। সহায়তার অর্থ বণ্টনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে প্রকাশ্য তালিকা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত।

তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মামলাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। মামলা দায়ের থেকে বিচারিক নিষ্পত্তি পর্যন্ত অগ্রগতি প্রকাশ করলে নাগরিক ও সংবাদমাধ্যম জবাবদিহি দাবি করতে পারবেন।

চতুর্থত, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে আগাম সতর্কতা এবং গুজব যাচাইয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তবে এসব উদ্যোগ যেন কোনো সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি বা মতপ্রকাশ দমনের হাতিয়ার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ও সাংগঠনিক আচরণে ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অভিন্ন নীতিতে আসতে হবে। ক্ষমতায় থাকা বা বিরোধী দলে থাকার ওপর নৈতিক অবস্থান বদলে গেলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুযোগ থেকেই যাবে।

সবশেষে, পাঠ্যক্রম, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় সামাজিক উদ্যোগে নাগরিক সমতার ধারণাকে শক্তিশালী করতে হবে। অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে নিজের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে বোঝার সংস্কৃতি তৈরি না হলে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।

শেষ কথা: যে নিরাপত্তা সবার নয়, তা কারও জন্যই স্থায়ী নয়

২০২১ সালের শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে দুটি ছবি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

একদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, উন্নয়ন ও অগ্রগতির উদ্‌যাপন। অন্যদিকে শাল্লার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কুমিল্লার ভাঙা মন্দির, নোয়াখালীর স্বজনহারা মা এবং পীরগঞ্জের আগুনে পোড়া ঘরবাড়ি।

এই দুই বাস্তবতার একটিকে আড়াল করে অন্যটিকে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় অর্জন বলা যায় না।

রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু সেতু, সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে পরিমাপ করা যায় না। একজন দুর্বল নাগরিক বিপদের মুহূর্তে কতটা নিরাপত্তা পান, তাঁর অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পায় এবং তাঁর ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার কতটা নিরপেক্ষভাবে হয়—এসবও উন্নয়নের মৌলিক সূচক।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ২০২১ আমাদের সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো নাগরিককে অতিরিক্ত অধিকার দেয় না। আর সংখ্যালঘু পরিচয় কোনো নাগরিকের অধিকার কমিয়ে দেয় না।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে জরুরি অঙ্গীকার হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ, যেখানে কেউ নিজের ধর্মের কারণে নিরাপত্তা ভিক্ষা করবেন না; আইন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাবেন নাগরিক হিসেবে।

কারণ একটি দেশের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় শুধু সে কত শক্তিশালী, তা দিয়ে নয়; বরং তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটিকে সে কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তা দিয়ে।

– S. Das

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *