Thu. Nov 5th, 2026

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে নিরাপত্তাহীনতার নির্মম বাস্তবতা

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রজুড়ে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উদ্‌যাপন চলছে। অথচ এই গৌরবের বছরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়েছে, প্রতিমা ভেঙেছে, উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে। যে দেশে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই দেশেরই কিছু নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

২০২১ সালের মার্চে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে সংঘবদ্ধ হামলা এবং অক্টোবরে কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী, চাঁদপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা জাতীয় বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

কোথাও একটি ফেসবুক পোস্ট, কোথাও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ, আবার কোথাও স্থানীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনায় একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে—আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে সহিংসতার অজুহাত বানানো সহজ হয়ে যায়।

প্রতিটি হামলার পর সরকার দোষীদের বিচারের আশ্বাস দিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু আক্রান্ত মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—হামলা হওয়ার আগেই তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেল না কেন?

২০২১ সালের শেষে দাঁড়িয়ে তাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর সংকট হিসেবে বিচার করা প্রয়োজন।

শাল্লা: ধর্মীয় উত্তেজনার আড়ালে স্থানীয় স্বার্থের প্রশ্ন

১৭ মার্চ ২০২১। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজন চলাকালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে কয়েক শ মানুষ হামলা চালায়।

হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সমালোচনা করে স্থানীয় যুবক ঝুমন দাস আপন ফেসবুকে একটি মন্তব্য করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার পর তাঁকে আগেই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও সংঘবদ্ধ হামলা ঠেকানো যায়নি।

দ্য ডেইলি স্টারের ১৭ মার্চের সংবাদ অনুযায়ী, অন্তত ৭৫টি হিন্দু পরিবারের বাড়ি আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৩৫টি বাড়ি গুরুতর এবং ৪০টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানান সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক।

হামলায় ঘরের আসবাবপত্র, মূল্যবান সামগ্রী ও ধর্মীয় প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি শুধু সম্পদ হারানোর ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা গ্রামেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা।

তদন্তে স্থানীয় জলমহাল নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও সামনে আসে। হামলার মামলার প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শহিদুল ইসলাম স্বাধীনের নাম উঠে আসে। তাঁর সঙ্গে গ্রামের কয়েকজনের জলমহাল-সংক্রান্ত বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় উত্তেজনা কি স্থানীয় অর্থনৈতিক বিরোধকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছিল?

বিষয়টি তদন্তযোগ্য হলেও ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য দিয়ে জলমহালের বিরোধকেই হামলার একমাত্র কারণ বলা যায় না।

শহিদুলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে তাঁকে যুবলীগের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে সেই পরিচয় অস্বীকার করা হয়। ফলে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে প্রমাণিত সাংগঠনিক নির্দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এপ্রিল মাসে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—যেখানে আগের দিন থেকেই উত্তেজনা ছিল, সেখানে পরদিনের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর প্রস্তুতি কেন নেওয়া হয়নি?

কুমিল্লা: একটি ছবি, ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা এবং ভয়াবহ পরিণতি

১৩ অক্টোবর ২০২১। দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন পাওয়া যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর কুমিল্লার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর এবং সংঘর্ষ ঘটে।

পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দাবি করে, ইকবাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। ২১ অক্টোবর তাঁকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই তথ্য প্রাথমিক প্রচারণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি একাই কাজ করেছিলেন, নাকি অন্য কেউ তাঁকে প্ররোচিত করেছিলেন—সেই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি তখনও হয়নি।

কুমিল্লার ঘটনায় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল নিরাপত্তা প্রদানে বিলম্বের অভিযোগ।

১৫ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একাধিক মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য জানান, হামলার আশঙ্কায় পুলিশ ও জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করেও সময়মতো সহায়তা পাননি।

চান্দমণি রক্ষাকালী মন্দিরে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একাধিকবার হামলার চেষ্টা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আক্রমণকারীরা মই, হাতুড়ি ও দাহ্য পদার্থ নিয়ে আসে।

তবে কুমিল্লা পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।

এখানে দুই ধরনের ব্যর্থতার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা জরুরি। প্রথমত, উসকানিমূলক প্রচার দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা। দ্বিতীয়ত, সহিংসতার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থলে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারা।

একটি ধর্মীয় অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি অনুসন্ধান করবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের আগেই অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনালয় আক্রমণ করার কোনো নৈতিক বা আইনগত অধিকার কারও নেই।

নোয়াখালী: উপাসনালয়েও যখন নিরাপত্তা নেই

কুমিল্লার সহিংসতার প্রভাব দ্রুত নোয়াখালীতে পৌঁছে যায়।

১৫ অক্টোবর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে সংঘবদ্ধ হামলায় একাধিক মন্দির, প্রতিমা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়।

হামলায় যতন সাহা নিহত হন। পরদিন একটি মন্দিরের পাশের পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় ইসকনভক্ত প্রান্ত চন্দ্র দাসের মরদেহ।

প্রথম আলোর সমসাময়িক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় আরও অনেকে আহত হন এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৪৪ ধারা জারি করে।

নোয়াখালীর ঘটনা বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। কারণ মানুষের কাছে উপাসনালয় সাধারণত শান্তি, আশ্রয় ও আস্থার জায়গা। সেই জায়গায় হামলা হলে ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মন্দিরের প্রতিমা পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু সন্তান হারানো পরিবারের ক্ষতি কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত হওয়ার ভয় সহজে দূর করা যায় না।

এই সহিংসতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে। কোনো নাগরিক যদি নিজের ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে জীবন হারানোর আশঙ্কা করেন, তবে সংবিধানে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার বাস্তব অর্থ কতটুকু থাকে?

অপরাধীদের গ্রেপ্তার জরুরি। তবে একই সঙ্গে হামলার সময় নিরাপত্তা কোথায় ছিল, প্রশাসনের পূর্বপ্রস্তুতি কতটা কার্যকর ছিল এবং স্থানীয়ভাবে কারা উত্তেজনা ছড়িয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

রংপুরের পীরগঞ্জ: পোড়া ঘর, হারানো সঞ্চয় ও জীবিকার সংকট

১৭ অক্টোবর রংপুরের পীরগঞ্জে ঘটে আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা।

এক তরুণের কথিত ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

১৮ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ৬৬টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। অন্তত ২৫টি বাড়ি ও দোকান পুড়িয়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের পৃথক প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন ছিল।

পীরগঞ্জে পুলিশ কথিত ফেসবুক পোস্টদাতার বাড়িতে নিরাপত্তা দিয়েছিল। কিন্তু আশপাশের অন্য বাড়িগুলোকে হামলা থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

এখানেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নিষ্ঠুরতম বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ পায়। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে একই সম্প্রদায়ের বহু নিরপরাধ মানুষকে সম্মিলিতভাবে শাস্তি দেওয়া হয়।

হামলার পর একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে র‍্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন এক নেতার বিরুদ্ধে হামলায় উসকানি ও পরিকল্পনার অভিযোগ ওঠে। সংগঠনটি তাঁকে বহিষ্কার করে।

অন্যদিকে ২৫ অক্টোবর পুলিশ ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা একজনসহ আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়।

এই ভিন্ন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দেখায়, তদন্তের আগে পুরো ঘটনাকে একটি দলের পরিকল্পনা হিসেবে ঘোষণা করা দায়িত্বশীল অবস্থান নয়। গ্রেপ্তার ও তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবেও দেখানো যায় না।

পীরগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনেকেই সীমিত আয়ের পরিবার। বাড়ির পাশাপাশি তাঁদের খাদ্যশস্য, গবাদিপশু, নগদ অর্থ ও ব্যবহার্য সামগ্রী হারানোর অভিযোগ উঠে আসে।

২০ অক্টোবর ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন। সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত ২৮টি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা এবং আরও ৩৮টি পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়।

তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজনীয় হলেও একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, জীবিকার উপকরণ ও মানসিক ক্ষতির পূর্ণ প্রতিকার এত সীমিত অর্থে সম্ভব কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চাঁদপুর: জনতার সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের সীমা

১৩ অক্টোবর রাতে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জেও মন্দিরকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে।

১৪ অক্টোবর সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস চারজন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে। পরবর্তী বিভিন্ন সমসাময়িক প্রতিবেদনে মৃত্যুর হিসাবে পরিবর্তন আসে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পুলিশের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি মনে করিয়ে দেয়, সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার নীতি মেনে চলতে হয়।

এখানে দুটি অপরাধ-সংক্রান্ত প্রশ্ন আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। যারা মন্দিরে হামলা করেছে, তাদের দায় নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে জনতা নিয়ন্ত্রণের সময় প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ অপরিহার্য ছিল কি না, তাও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নির্বিচার বলপ্রয়োগ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি বলপ্রয়োগের বিতর্কের আড়ালে সংঘবদ্ধ হামলার দায়ও চাপা দেওয়া যায় না।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রতিটি পক্ষের জন্য একই ন্যায়বিচারের মানদণ্ড প্রয়োগ করা।

পরিসংখ্যান বলছে, সংকটটি বিচ্ছিন্ন নয়

২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক মানবাধিকার পর্যালোচনা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আনে।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২১ সালে অন্তত ২০৪টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ বা মন্দির আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১৮৪টি বসতবাড়ি ও ৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলোকে পৃথক হামলার সংখ্যা হিসেবে একত্র করা সঠিক হবে না। এগুলো ভিন্ন ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও সম্পদের হিসাব।

অন্যদিকে ২৭ ডিসেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বছরশেষের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১৩ থেকে ২০ অক্টোবরের সহিংসতায় নয়জন নিহত এবং অন্তত ২০০ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। সহিংস জনতার আক্রমণ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাগুলোও পৃথকভাবে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে সংস্থাটির নথিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলার ঘটনা রয়েছে।

পরিসংখ্যানের পদ্ধতি ও সময়সীমা পৃথক হলেও এসব তথ্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

একই ধরনের সহিংসতা বারবার ঘটলে সেটিকে শুধু আকস্মিক জনরোষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। তখন বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভূমিকা গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হয়।

রাজনৈতিক দায়: ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং অভিযোগের রাজনীতি

অক্টোবরের সহিংসতার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপরাধীদের ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের প্রতিশ্রুতি দেন।

সরকার বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা দেয় এবং গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করে। ১৮ অক্টোবর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় ৭১টি মামলা এবং ৪৫০ জনকে গ্রেপ্তার বা আটকের কথা জানানো হয়।

এসব পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার অংশ। কিন্তু হামলার পর গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে আগাম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যর্থতা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

রাজনৈতিক বিতর্কও দ্রুত তীব্র হয়। আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ কেউ বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও সরকারের ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে পাল্টা অভিযোগ করা হয়।

কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য আর আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এক নয়।

শাল্লার অভিযুক্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা পীরগঞ্জে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের বিষয়টি দেখায়, অপরাধে রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্ভাব্য ভূমিকা অনুসন্ধান করা জরুরি। কিন্তু কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর পুরো সংগঠনকে অপরাধী ঘোষণা করাও যুক্তিসংগত নয়।

ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি, কারণ প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব সরকারের হাতে।

তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের সাম্প্রদায়িক উসকানি থেকে বিরত রাখা, আক্রান্ত নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তোলা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আচরণের অংশ।

কোনো সম্প্রদায়কে একটি রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সমর্থক ধরে নেওয়ার প্রবণতাও বিপজ্জনক। নাগরিকের নিরাপত্তা কখনো তাঁর ভোটের সম্ভাব্য অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: গুজবের বিস্তার, না সংগঠিত উসকানি?

২০২১ সালের বড় কয়েকটি সাম্প্রদায়িক হামলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শাল্লায় একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, কুমিল্লায় ছবি ও ভিডিও প্রচার এবং পীরগঞ্জে কথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ—এসব ঘটনায় অনলাইন প্রচারের পর অফলাইনে সংঘবদ্ধ সহিংসতা দেখা গেছে।

কিন্তু ফেসবুককে দায়ী করেই বিশ্লেষণ শেষ করা যায় না।

একটি গুজব শত শত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সেই গুজবকে কেন্দ্র করে মিছিল সংগঠিত করা, বাড়িঘরে হামলা চালানো কিংবা অগ্নিসংযোগ করার সিদ্ধান্ত মানুষই নেয়।

ফলে তদন্তে শুধু মূল পোস্টদাতা নয়, সম্ভাব্য উসকানিদাতা, সংগঠক এবং প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের ভূমিকা আলাদা করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়েও সতর্কতা জরুরি। প্রকৃত সহিংসতার উসকানি প্রতিরোধ করতে হবে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অযৌক্তিকভাবে সংকুচিত করে কিংবা অস্পষ্ট ধর্মীয় অভিযোগে নির্বিচার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

গুজব প্রতিরোধের কার্যকর পথ হলো দ্রুত তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে নিশ্চিত আইনগত ব্যবস্থা।

সংখ্যালঘুদের জমি, জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

সাম্প্রদায়িক হামলার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দিক নিয়ে আলোচনা হলেও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।

শাল্লায় জলমহাল-সংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগ মনে করিয়ে দেয়, স্থানীয় সম্পদ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কখনো ধর্মীয় উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশে অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত জটিলতা, জমি দখলের অভিযোগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পত্তির নিরাপত্তা দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ২০২১ সালের মার্চে প্রকাশিত ক্রিশ্চিয়ান সলিডারিটি ওয়ার্ল্ডওয়াইডের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-অধিকার এবং বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

তবে প্রতিটি সাম্প্রদায়িক হামলার উদ্দেশ্য জমি দখল—এমন সিদ্ধান্তও প্রমাণ ছাড়া দেওয়া উচিত নয়।

অর্থনৈতিক ক্ষতির বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান ভাঙলে পুঁজি হারায়। কৃষকের ঘর পুড়লে খাদ্যশস্য ও উৎপাদনের উপকরণ নষ্ট হয়। দিনমজুরের পরিবার বাড়িঘর হারালে কাজের সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়।

করোনা মহামারির আর্থিক চাপের মধ্যে ২০২১ সালে এসব ক্ষতি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক।

একজন ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের পুনর্বাসন মানে শুধু নতুন টিনের চাল দেওয়া নয়। তাঁর আয়, সঞ্চয়, সন্তানদের শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা পুনর্গঠনের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

সহায়তা বণ্টনের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনিয়ম বা পক্ষপাতের সুযোগ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। সে কারণে সরকারি পুনর্বাসনের তালিকা ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ্য হওয়া উচিত।

প্রশাসনিক জবাবদিহি: গ্রেপ্তারের পর কী হয়?

অক্টোবরের সহিংসতার পর পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান দ্রুত শুরু হয়। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ দিকে এসে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত ২৭ ডিসেম্বরের সমসাময়িক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেন, হামলার মামলাগুলোতে যথেষ্ট বিচারিক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

এটি তাঁর সংগঠনের মূল্যায়ন, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তবু অভিযোগটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মামলার সংখ্যা বাড়লেও অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য ও বিচারিক নিষ্পত্তির অগ্রগতি না হলে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের আস্থা ফিরে আসে না।

২৮ অক্টোবর হাইকোর্ট কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও রংপুরের সহিংসতার ঘটনায় বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন কেন আক্রান্ত নাগরিকদের রক্ষা করতে পারেনি, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চান আদালত।

এটি প্রশাসনের দায়িত্ব পরীক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে অনুসন্ধানের নির্দেশকে কোনো কর্মকর্তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য বিবেচনা করা যায় না।

প্রকৃত জবাবদিহির জন্য জানতে হবে, হামলার পূর্বাভাস কে পেয়েছিলেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কেন প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে এগোচ্ছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: সাংবিধানিক অঙ্গীকারের বাস্তব পরীক্ষা

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত এবং অন্যান্য ধর্ম পালনের অধিকারও সংবিধানে সংরক্ষিত।

এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে কোনো দ্ব্যর্থতার সুযোগ নেই।

২০২১ সালের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সামাজিক ঐতিহ্য থাকলেই আইনি নিরাপত্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয় না।

অক্টোবরে হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মানবাধিকারকর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ করেছেন।

শাহবাগে সমাবেশ, অবস্থান কর্মসূচি ও অনশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিবাদ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধী শক্তির পরিচয় দেয়।

কিন্তু প্রতিবাদ তখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে, যখন তা কার্যকর আইন, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতে প্রতিফলিত হবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শুধু উৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময় নয়। এর অর্থ এমন একটি সমাজ, যেখানে কেউ নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পাবেন না এবং বিপদের সময় প্রতিবেশী ও রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারবেন।

২০২১ সালের অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্রের করণীয়

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন জরুরি হয়ে উঠেছে।

প্রথমত, বড় হামলাগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বাস্তবসম্মত ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। বাড়িঘর মেরামতের পাশাপাশি জীবিকা, চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্ষতি বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, ধর্মীয় উৎসব ও সম্ভাব্য উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আগাম নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে গুজবের সত্যতা যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। এতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন, গ্রেপ্তারের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।

পঞ্চমত, সব রাজনৈতিক দলকে সাম্প্রদায়িক উসকানি ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট সাংগঠনিক অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি প্রমাণ ছাড়া বিরোধী পক্ষকে অপরাধী ঘোষণা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

সবশেষে, শিক্ষাব্যবস্থা ও স্থানীয় সামাজিক উদ্যোগে নাগরিক সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে শক্তিশালী করতে হবে।

শেষ কথা: স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও যে প্রশ্নের উত্তর বাকি

২০২১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর হিসেবে স্মরণীয়। কিন্তু এই একই বছর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবে ভাঙা প্রতিমা, পোড়া বসতভিটা এবং নিরাপত্তাহীনতার বছর হিসেবে।

রাষ্ট্র উন্নয়নের সাফল্য উদ্‌যাপন করতে পারে। কিন্তু যে নাগরিক নিজের বাড়িতে নিরাপদ নন, তাঁর কাছে উন্নয়নের অর্থ অসম্পূর্ণ।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষের জীবন, সম্পদ বা উপাসনালয় আক্রান্ত হলে তা শুধু একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের নৈতিকতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক সক্ষমতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশকে তাই শুধু হামলার পর শান্তি ফিরিয়ে আনার রাষ্ট্র হলে চলবে না; এমন রাষ্ট্র হতে হবে, যেখানে হামলা প্রতিরোধের ব্যবস্থা আগে থেকেই কার্যকর থাকে এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর প্রশ্নটি আর কেবল বাংলাদেশ কত দূর এগিয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই অগ্রগতির পথে দেশের সবচেয়ে অসহায় নাগরিকটিও কি সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা পেয়েছেন?

যে স্বাধীনতা সব নাগরিককে সমানভাবে নিরাপদ রাখতে পারে না, তার প্রতিশ্রুতি এখনো পূর্ণতা পায়নি।

-S.Das

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *